• শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম:
নির্দেশ বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নিজ দপ্তরে লাইট ও এসির মাত্রা কমালেন প্রধানমন্ত্রী কাঞ্চন পৌরবাসীর প্রত্যাশা—মেয়র হিসেবে দেখতে চান অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম ইমনকে ঈদের ছুটি বেড়ে ৭ দিন, ১৮ মার্চ ছুটির সিদ্ধান্ত সরকারের আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব তলব হঠাৎ ভূমি অফিসে প্রতিমন্ত্রী, আধাঘণ্টা অপেক্ষার পর খোলা হলো তালা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আনসারকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা খামেনির ছেলে মোজতবা রূপগঞ্জে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে উচ্ছেদ অভিযান দুই কমিশনারসহ দুদক চেয়ারম্যানের পদত্যাগ চালের দাম বৃদ্ধির খবর শুনে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

আইনের তোয়াক্কা না করে ডিপিডিসির এমডি মিজানুল

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ / ১৩৬ পাঠক ভিউ
আপডেট সময় : সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫

নিজস্ব  প্রতিবেদক: ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বি এম মিজানুল হাসানকে নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশের বিদ্যুৎ খাত ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বেআইনি, অস্বচ্ছ ও সংবিধানবিরোধী আখ্যা দিয়ে ইতোমধ্যে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে, যার কোনো জবাব না দিয়েই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুনরায় একই ব্যক্তিকে ওই পদে বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী, প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ এবং বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন ও মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়া কি উপেক্ষিত হচ্ছে?

সূত্র জানায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ গত ২২ অক্টোবর ডিপিডিসিকে একটি চিঠির মাধ্যমে জানায় যে, বি এম মিজানুল হাসানকে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ডিপিডিসির ৩৮৭তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এ সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এই বক্তব্যকে ঘিরেই শুরু হয়েছে মূল বিতর্ক। আইনজীবীদের দাবি, ওই বোর্ড সভায় এমডি পদে চূড়ান্ত নিয়োগের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি; কেবল প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

ডিপিডিসির এমডি পদে নিয়োগের জন্য পরিচালিত প্রক্রিয়ায় লিখিত, প্রেজেন্টেশন ও মৌখিক সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে একটি মেধাতালিকা প্রস্তুত করা হয়। এই তালিকায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে ছিলেন যথাক্রমে সাব্বির আহমেদ, মো. শরিফুল ইসলাম ও বি এম মিজানুল হাসান। বিদ্যুৎ বিভাগ পরবর্তীতে যুক্তি দেয় যে, প্রথম স্থানে থাকা সাব্বির আহমেদের কানাডাভিত্তিক ‘অ্যালায়েন্স পাওয়ার’-এ কাজের অভিজ্ঞতা বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এ কারণ দেখিয়ে তাঁকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এরপর শরিফুল ইসলাম ও মিজানুল হাসানকে নিয়ে নতুন তালিকা তৈরি করা হয় এবং ২২ অক্টোবর বিকেলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান এই দুই প্রার্থীর সাক্ষাৎকার নেন। ওই দিনই প্রজ্ঞাপন জারি করে বি এম মিজানুল হাসানকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

এই দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পূর্বে পাঠানো আইনি নোটিশের কোনো জবাব না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা জেলা জজ আদালতের আইনজীবী তাহমিমা মহিমা বাঁধন। তিনি বলেন, বোর্ড সভার সিদ্ধান্তকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে “বোর্ডের সিদ্ধান্তের আলোকে” শব্দবন্ধ ব্যবহার করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, যা প্রশাসনিকভাবে বিভ্রান্তিকর ও আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, এটি একটি গুরুতর প্রশাসনিক অসদাচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের শামিল।

আইনজীবী তাহমিমা বাঁধন আরও বলেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমান সুযোগ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নীতির পরিপন্থী। লিখিত, প্রেজেন্টেশন ও মৌখিক পরীক্ষায় শীর্ষে থাকা দুই প্রার্থীকে বাদ দিয়ে তৃতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য প্রতিযোগিতার উদাহরণ হতে পারে না।

তাঁর ভাষায়, “মেধা উপেক্ষা মানে সংবিধান উপেক্ষা। বোর্ড যেহেতু মূল্যায়ন করেছে, সেখানে মেধার ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসা উচিত ছিল।” এই বিষয়ে আরেক আইনজীবী শাহ আলম বলেন, বি এম মিজানুল হাসানের পেশাগত অভিজ্ঞতা মূলত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-কেন্দ্রিক, যা বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিদ্যুৎ বিতরণ ও গ্রাহকসেবা ব্যবস্থাপনায় তাঁর সরাসরি অভিজ্ঞতা নেই। অথচ ডিপিডিসির মতো একটি বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিতরণ ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকসেবা, লস রিডাকশন ও নগরভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর নিয়োগ সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সূত্র আরও জানায়, ডিপিডিসির বর্তমান বোর্ডে থাকা তিনজন পরিচালকই পিজিসিবি থেকে আসা। বি এম মিজানুল হাসানও একই প্রতিষ্ঠান থেকে আগত হওয়ায়, ডিপিডিসির ভেতরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকেন্দ্রিক প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ বিতরণ খাতের বাস্তব সমস্যা ও গ্রাহকসেবা চ্যালেঞ্জ বোঝার ক্ষেত্রে এই ধরনের একমুখী অভিজ্ঞতা সংস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

এই নিয়োগ নিয়ে আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে। জানা গেছে, ডিপিডিসির নতুন এমডির গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাড়ির পাশেই। সমালোচকদের একটি অংশ দাবি করছেন, এই বিষয়টি নিয়োগ বিতর্কে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে যে, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক আনুগত্য বা পরিচয়ের প্রভাব পড়ছে কি না।আইনজীবীরা বলছেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—এই নিয়োগ প্রক্রিয়া এমন এক সময়ে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যখন সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে আইনের শাসন, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার দাবি আরও জোরালো হয়েছে। তাঁদের মতে, এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যদি আগের মতোই অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তা গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল।

আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বোর্ডের সিদ্ধান্ত ছাড়া এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অযোগ্য ও অভিজ্ঞতাহীন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা এবং সরকারি নথিতে ভুল উপস্থাপনার অভিযোগ আনা হয়েছে। নোটিশে আরও বলা হয়, এই নিয়োগ কার্যক্রম অকার্যকর ও অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তি ভবিষ্যতে আইনের আওতায় দায়বদ্ধ থাকবেন।

দীর্ঘ সময় ধরে আইনি নোটিশের কোনো জবাব না দিয়ে হঠাৎ করে পুনরায় একই ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় অনেকেই মনে করছেন, এটি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং পরিকল্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার। আইনজীবীদের মতে, রাষ্ট্র কি আইনের ঊর্ধ্বে—এই প্রশ্নটি এখানেই সামনে আসে। যদি সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে আইন প্রযোজ্য হয়, তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে নিয়োগ দিলে প্রশাসনিক নীতি, মেধার মূল্যায়ন এবং সরকারি অর্থ—সবকিছুই অর্থহীন হয়ে পড়ে। তাঁদের মতে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতা না থাকলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সেবার মান, কর্মীদের মনোবল এবং জনগণের আস্থার ওপর। ডিপিডিসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও স্পর্শকাতর।
ডিপিডিসির ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নেতৃত্বে কারিগরি দক্ষতা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে সংস্থাটির অনেক কার্যক্রমে ইতোমধ্যেই স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তাঁদের মতে, ৩৮৭তম বোর্ড সভায় প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বাধিক যোগ্য ও অভিজ্ঞ, তাঁকেই পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া উচিত ছিল। এতে সংস্থার কার্যক্রমে গতি আসত এবং বিতর্কও এড়ানো যেত।

আইনজীবী তাহমিমা মহিমা বাঁধন জানান, এই নিয়োগের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রুল জারি চেয়ে আবেদন করা হবে। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়া প্রথম দৃষ্টিতেই অবৈধ, ক্ষমতার সীমালঙ্ঘনমূলক এবং বিচারিক পর্যালোচনার যোগ্য। তিনি বলেন, এর দায় কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বোর্ডে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এই প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তি ও কর্তৃপক্ষকে আইনগতভাবে দায়ভার বহন করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই ঘটনায় একটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কি কেবল প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয়, নাকি তা সংবিধান ও আইনের কঠোর কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? যেখানে আইনের শাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়া পদদলিত হয়, সেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তাই এই নিয়োগ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আদালতের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে ডিপিডিসির এমডি নিয়োগ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সংবিধান মানার প্রশ্নে একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু বিচার এড়িয়ে যাওয়ার কোনো আইনসম্মত সুযোগ নেই—এমন মন্তব্য করে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা আশা প্রকাশ করছেন, শেষ পর্যন্ত আইনের মাধ্যমেই এই বিতর্কের নিষ্পত্তি হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিস্তারিত...
Link Copied!