চ্যারিটি প্রতিষ্ঠান ইভানজেলিক্যাল সেল চার্চ। ধর্মীয় এ প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফ্রান্স প্রবাসী আলফ্রেড মজুমদার রিংকু। ঢাকার মিরপুরের দুই নম্বরে অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানটি রিংকুর কাছ থেকে নিজের অনুকুলে নেন তারই বড় ভাই পিটার দিবাকর মজুমদার। অভিযোগ রয়েছে, নিজের অনুকুলে নিয়েই প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা বনে যান পিটার দিবাকর মজুমদার। আর সম্পাদক করা হয় অপর ভাই এলিস অরুণ মজুমদার। যে এলিস নারী ঘটিত কেলেঙ্কারির কারণে বিভিন্ন সংস্থা থেকে বিভিন্ন সময় চাকুরিচ্যুৎ হন। আর পুতুল চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয় অরুণ কান্তি বিশ্বাসকে। সংস্থাটির কোষাধ্যক্ষ করা হয় অপর ভাই সমীরনকে। আর এসব পদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ব্যবহার করে চ্যারিটি এ প্রতিষ্টানটির দেড় কেটি টাকা হাতিয়ে নেন পিটার মজুমদার। এমনই অভিযোগ করেছেন, ওই সংস্থাটির কোষাধ্যক্ষ্য পদে থাকা ব্যক্তি। তার দাবি, পিটার ও এলিস ওই টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে এবং নিজেদের আড়ালে রাখতে চেয়ারম্যান ও কোষাধ্যক্ষকে আসামি করে মামলা দেয়া হয়েছে। যা চলমান রয়েছে।
তার দাবি প্রতিষ্ঠানটিতে ঢাকার একজন সদস্য না থাকলেও ছিলো ৫ সদস্যের একটি পরিচালনা বোর্ড। আর সব কিছুৃতে কলকাঠি নাড়তেন পিটার। ধর্মীয় ও সমাজ সেবার নামে প্রতিষ্ঠানটি ছিলো পিটারের আয়ের অন্যতম উৎস। চেয়ারম্যান এবং কোষাধ্যক্ষের যৌথ স্বাক্ষরে টাকা উত্তোলন করা হলেও টাকা নিয়ে যেতেন পিটার দিবাকর মজুমদার। সর্বশেষ কিছুদিন আগে চেয়ারম্যান এবং কোষাধ্যক্ষের যৌথ স্বাক্ষরে চারটি পৃথক চেকে ভিন্ন ভিন্ন দিনে দেড় কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়।
এতে চারটি চেকে টাকা উত্তোলন করতে সময় লাগে ২০ দিন এবং প্রথম চেকের টাকা উত্তোলন করার পর অন্য চেক দেয়া হতো কোষাধ্যক্ষকে। কোষাধ্যক্ষ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অরুণ কান্তি বিশ্বাসের কাছে পূর্বের মতো টাকা উত্তোলন করে দিয়ে আসেন। কিন্তু অরুণ কান্তি বিশ্বাস সমস্ত টাকা পাওয়ার পর দাবি করেন যে, কোষাধ্যক্ষ তাকে টাকা দেননি। কোষাধ্যক্ষর ভাষ্যমতে চেয়ারম্যান পুরো টাকাই উপদেষ্টাকে বুঝিয়ে দিয়ে এখন উপদেষ্টার চাপে তাকে দোষারোপ করছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি চেক দেয়ার পর টাকা উত্তোলন করে চেয়ারম্যানের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে আরেকটি চেক এনেছেন। কিন্তু উপদেষ্টা ছলচাতুরী করে তাদেরকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন। এমনকি চেয়ারম্যানকে হুমকি দিয়ে টাকা না পাওয়ার কথা বলতে বাধ্য করেছেন।
পিটার ও এলিস এতটাই স্বার্থপর নিজের অন্য ভাইদের পৈত্রিক সম্পতি দখল এবং জমানো টাকাও কৌশলে আটকে রেখেছেন।অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে আইনগতভাবে রক্ষার জন্য পিটার কখনো কখনো আগে থেকেই টার্গেট ব্যক্তির বিরুদ্ধে জিডি করেন। আবার তার সাথে কাজের চুক্তিও করেন। কাজ উদ্ধার হওয়ার পর অফিসে ডেকে নিয়ে জোর করে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। ফ্যাসিস্ট আওয়ামীলীগ আমলে তিনি সাবেক মন্ত্রী ও প্রভাবশালীদের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীদের হুমকি দিতেন।
ভুক্তভোগীদের একজন হাসি এন্টারপ্রাইজের মালিক পিটার মিল্টন বাড়ৈ। তিনি জানান, গত ২০১১ সালে তার প্রতিষ্ঠান মিরপুরে অবস্থিত বিএসএফবি’র সাধারণ সম্পাদক পিটার মজুমদারের সাথে তার আশুলিয়ার লিভিং ওয়াটার বিল্ডিং এর দু’টি ফ্লোর তৈরীর জন্য চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু একটি ফ্লোরের কাজ শেষ হতে না হতেই পিটার মজুমদার অনৈতিক কাজ করাতে প্রলুব্ধ করে। এতে সায় না দেয়ায় পিটার মজুমদার তাকে অফিসে ডেকে নিয়ে কাজের মোটা অঙ্কের টাকা না দিয়ে জোর করে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়। বিষয়টি কাউকে প্রকাশ করলে মেরে ফেলারও হুমকি দেয়। এ ঘটনায় তিনি মিরপুর থানায় অভিযোগ করলেও আওয়ামীলীগের এক প্রভাবশালী নেতার ফোন পেয়ে পুলিশ তদন্ত সমাপ্ত করেনি। বাধ্য হয়ে পিটার বাড়ৈ খ্রিষ্টান কমিউনিটির উচ্চপদে থাকা বিভিন্ন জনের দ্বারস্থ হন। কিন্তু তারা পিটার মজুমদারকে বিষয়টি মীমাংসার জন্য চিঠি দিলেও পিটার মজুমদার তাতে সাড়া দেননি।
ভুক্তভোগী পিটার বাড়ৈ বলেন, পাওনা টাকা ফেরত চাইলে এখনো তাকে হুমকি দিচ্ছে পিটার মজুমদার। তিনি এ নিয়ে আতঙ্কের রয়েছেন। সংশ্লিস্টরা, পিটার প্রতিষ্ঠানের টাকা ইচ্ছেমতো টাকা আত্মসাৎ করতেন। আবার ভূয়া ভাউচার তৈরী, এবং বিভিন্ন জনকে সহায়তা করেছেন এমন মিথ্যা তথ্য দিয়ে টাকার হিসেব ঠিক রেখে কাগজপত্র আপডেট রাখতেন। বিদেশ থেকে অনুদান আনা, দেশে চার্চ তৈরীসহ যা করার সবই করতেন পিটার মজুমদার। বিদেশীদের অনুপ্রাণিত করার মতো তার যথেষ্ট যোগ্যতা রয়েছে। আর এসব মেধাই তিনি ব্যবহার করতেন অনৈতিক কাজে। এমনকি তিনি বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের অসামাজিক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথেও যুক্ত হন।
অভিযোগ রয়েছে, ইভানজেলিক্যাল সেল চার্চের পাষ্টর ও সদস্যদের দিয়েই তিনি আরেক নামে চার্চ (সি-৩ চার্চ) নামে দেখাচ্ছেন। দুটি চার্চ থেকে অনুদান নিয়ে একই কার্যক্রম চালাচ্ছেন। যখন কোনো ডোনার ইভানজেলিক্যাল সেল চার্চ পরিদর্শনে আসেন তখন সেই চার্চের সাইনবোর্ড ব্যবহার করা হয়। একইভাবে যখন সি-৩ চার্চের বিদেশি প্রতিনিধি পরিদর্শনে আসেন তখন ইভানজেলিক্যাল সেল চার্চের সাইনবোর্ড খুলে সি-৩ সাইনবোর্ড লাগিয়ে বিদেশি প্রতিনিধিদের সন্তুষ্ট করে অনুদান নিতেন। ইভানজেলিক্যাল সেল চার্চের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বিএসএফবি, লিভিং ওয়াটার সেন্টার, জয়ধ্বণি ট্রাস্ট, এশিয়ান এক্সেস, নূর মিশন, বাংলাদেশ পরিচর্যা চার্চ, বিটি প্রজেক্টসহ বিভিন্ন এনজিও ও সংস্থার টাকা বিদেশ থেকে আনা হয়। সার্ভিস চার্চ বাবদ সেখান থেকে ২ শতাংশ কেটে রাখা হয়। কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, মিরপুর শাখার (হিসাব নং-১৮১২০০৪৩৪২) মাধ্যমে এসব করা হয়। কারণ এনজিওর টাকা বিদেশ থেকে আনতে হলে সরকারিভাবে এনজিও ব্যুরোকে অনেক জবাবদিহি করতে হয়। কিন্তু চার্চের নামে টাকা আনলে কোনো জবাবদিহিতা নেই। জানতে চেয়ে পিটার দিবাকর মজুমদারের ফোনে কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পঅটানো হলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।