বিশেষ প্রতিনিধি : ৩৮তম বিসিএসের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আসিফ আল হাসান ও তার পরিবার আজ সাবেক স্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহারের কাছে কার্যত অসহায়। ডিভোর্সের এক বছরেরও বেশি সময় পার হলে ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক সাজানো ও মিথ্যা মামলায় এএসপি আসিফ ও তার পরিবারকে জড়িয়ে হয়রানি অব্যাহত রেখেছেন তার সাবেক স্ত্রী সুবর্না সুলতানা সুমী। অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে পুলিশ প্রশাসনের একটি অংশকে ব্যবহার করে যে নাটকীয়তা সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
২০২১ সালের ৪ মার্চ এএসপি আসিফ আল হাসানের সঙ্গে সুবর্না সুলতানা সুমীর বিয়ে হয়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিয়ের পর থেকেই সুমীর বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে তাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি শুরু হয়। বিয়ের মাত্র এক মাসের মধ্যেই ফারস হোটেলে অবস্থানকালে সুমীর মোবাইলে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে আপত্তিকর কথোপকথনের প্রমাণ পান আসিফ। তখন সুমী নিজেই অনুরোধ করেন বিষয়টি গোপন রাখতে এবং ডিভোর্সের প্রস্তাব দেন।
এএসপি আসিফ মৌলিক প্রশিক্ষণে বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে অবস্থানকালে সুমীকে মতিঝিল ব্যাংকার্স কলোনির সরকারি বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর তিনি নিজেকে অবিবাহিত পরিচয় দিয়ে অন্যত্র বসবাস শুরু করেন এবং ঠিকানা গোপন রেখে অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান বলে অভিযোগ। প্রশিক্ষণ শেষে আসিফ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে পদায়িত হলে সুমী বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। আসিফের অনুমতি ছাড়াই বদলি, সরকারি বাসস্থানসহ নানা বিষয়ে পুলিশের দপ্তরে যাতায়াত করতে থাকেন, যার কারণে একাধিকবার আসিফকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হয়।
আসিফ ও তার পরিবারের দাবি, সুমী গভীর রাত ও ভোরে বাসায় ফিরতেন এবং এসব বিষয়ে প্রশ্ন তুললে চাকরিতে অভিযোগ দেওয়ার হুমকি দিতেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের এক কর্মকর্তার কাছ থেকেও সুমীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক ও হয়রানির তথ্য পান এএসপি আসিফ। পাশাপাশি একটি বেসরকারি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গেও অনৈতিক সম্পর্কের বিষয় সামনে আসে।
২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর সুমী এএসপির স্ত্রী পরিচয়ে পল্লবী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৪০৫) করেন। তদন্তে ওই জিডির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায়, সুমী নিজেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একাধিক বার ফোন করেছিলেন। এমনকি একজন পুলিশ সুপারকে জড়িয়ে মিথ্যা বক্তব্য দিলেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ৯ নভেম্বর দুই পরিবারের বৈঠকে সুমীর মা ও মামারা ডিভোর্সের সিদ্ধান্তে সম্মত হয়ে পাওনা পরিশোধের অনুরোধ করেন। কিন্তু পরদিনই সুমী পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে আসিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন এবং ২৪ নভেম্বর একই অভিযোগ পুনরায় দাখিল করেন। অবশেষে ২৫ নভেম্বর ২০২৪ আসিফ তাকে ডিভোর্স প্রদান করেন।
ডিভোর্সের পর সুমী এক কোটি টাকা দাবি করেন—না দিলে মামলা করে চাকরি শেষ করে দেবেন বলে হুমকি দেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ১ জানুয়ারি ২০২৫ শাহজাহানপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। সেদিনই পুলিশের উপস্থিতি তে প্রায় ১৪ লাখ টাকার মালামাল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আসিফ ১৯ জানুয়ারি উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। পরদিনই হাতিরঝিল থানায় মারধর ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আরেকটি জিডি করা হয়, যা তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে কোতোয়ালি থানায় করা আরেকটি জিডির ভিত্তিতে চাপ প্রয়োগ করে মিথ্যা সাক্ষ্য যুক্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। যথেষ্ট প্রমাণ ও অডিও ক্লিপ দাখিলের পরও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১১(গ) ধারায় চার্জশিট দেওয়া হয়। মামলার তারিখ অনুযায়ী অধিকাংশ ঘটনায় আসিফের মোবাইল লোকেশন ঘটনাস্থলে না থাকার তথ্যও উঠে আসে। নতুন মামলা ও ‘অদৃশ্য শক্তির’ অভিযোগ এরপর গাজীপুর সদর থানায় ধর্ষণ মামলা করার চেষ্টা করা হলে প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। কিন্তু সুমীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সর্বশেষ ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ রাজশাহী মেট্রোর বোয়ালিয়া থানায় তিন বছরের পুরোনো ঘটনার উল্লেখ করে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে ডিভোর্সের পরও নিজেকে আসিফের স্ত্রী দাবি করা হয়েছে।
মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত এএসপি আসিফ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে সংযুক্ত। ক্যান্সার আক্রান্ত সাবেক অতিরিক্ত সচিব পিতাকে নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও তিনি ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। প্রতিবেদকের কাছে আসা একটি ভিডিও ক্লিপে সুমীকে বলতে শোনা যায়,“আমার কাছে আইজি স্যারসহ সবার নাম্বার আছে। আমি এখনই মামলা রেকর্ড করাবো।”এই বক্তব্য সত্য হলে, মামলার এই ধারাবাহিকতা যে থামছে না—তা বলাই বাহুল্য। প্রশ্ন উঠেছে, সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, সেই পুলিশ কর্মকর্তাই যদি অদৃশ্য শক্তির কারণে আইনের আশ্রয় থেকে বঞ্চিত হন—তবে আইনের শাসন কোথায় দাঁড়িয়ে? এএসপি আসিফ আল হাসানের সাবেক স্ত্রী সুবর্না সুলতানা সুমী প্রতিবেদককে বলেন, “আসিফ আমার হাজব্যান্ড। আমি তাকে চিনি, তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা।” প্রতিবেদক তার কাছে জানতে চান, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) স্যারের সঙ্গে তার কোনো পরিচয় বা যোগাযোগ আছে কি না। জবাবে সুমী বলেন, “আইজিপি স্যারের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। আমি তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না।”
তিনি আরও দাবি করেন, “পুলিশ যাচাই–বাছাই করেই আসিফের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করেছে। আমি কখনোই আইজিপি স্যারের প্রভাব বিস্তার করিনি।” এ সময় প্রতিবেদক একটি ভিডিওর বিষয়ে প্রশ্ন করেন, যেখানে তাকে পুলিশ প্রধানের প্রভাব খাটানোর কথা বলতে দেখা যায়।
এ বিষয়ে সুমী বলেন, “না, বিষয়টি সত্য নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, “পুলিশের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার পরিবারের কেউ পুলিশ সদস্যও নয়। আমার পরিচয় বা ক্ষমতা বলতে শুধু আমার হাজব্যান্ড আসিফ আল হাসান—তিনি একজন পুলিশ কর্মকর্তা।”