দাগনভূঞা (ফেনী) প্রতিনিধিঃ ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী হয়রানি ও নানা অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে গিয়ে দায়িত্ব পালন কালে সাংবাদিকদের হেনস্তা ও অবরুদ্ধ করার অভিযোগ উঠেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। এ সময় হাসপাতালের মূল ফটকে তালা দিয়ে সাংবাদিকদের আটকে রাখা হয় এবং মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ ডিলেট করতে চাপ ও ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, রোগী হয়রানি ও অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে স্বদেশ টিভি নিউজ ও দৈনিক আমার সংগ্রাম-এর বিশেষ প্রতিনিধি ফরহাদ আহমেদ এবং দৈনিক বর্তমান বাংলা- এর দাগনভূঞা উপজেলা প্রতিনিধি আলা উদ্দিন আল হাসান হাসপাতালের বহির্বিভাগে সংবাদ সংগ্রহে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নামের সাইনবোর্ড থাকলেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা অনুপস্থিত।
একটি কক্ষে নার্সকে অবস্থান করতে দেখে বিষয়টি জানতে চাইলে সাংবাদিকরা ভিডিও ধারণের মাধ্যমে কথা বলার চেষ্টা করেন। এ সময় পাশের কক্ষ থেকে এক চিকিৎসক এসে কথা বলেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম সোহরাব আল হোসাইন সেখানে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিক ফরহাদ আহমেদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং ধারণকৃত ফুটেজ ডিলেট করার নির্দেশ দেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের ব্যাখ্যা বা ঘটনা জানার চেষ্টা না করে তিনি উত্তেজিত হয়ে সংশ্লিষ্ট কক্ষ বন্ধের নির্দেশ দেন এবং তার অধীনস্থদের দিয়ে হাসপাতালের মূল ফটকে তালা লাগান। ফলে সাংবাদিকরা ভেতরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান দৈনিক প্রতিদিনের কাগজ-এর দাগনভূঞা প্রতিনিধি শাহ আলম। তিনিও একই ধরনের হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। সাংবাদিকদের অভিযোগ, হাসপাতাল কর্মকর্তা সোহরাব আল হোসাইন মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পুলিশকে ফোন করে বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে সাংবাদিক ফরহাদ আহমেদের কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শোনেন। এ বিষয়ে ফরহাদ আহমেদ বলেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিক হিসেবে রোগীদের হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে গিয়েছিলাম।
অথচ কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমাকে কক্ষে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয় এবং পুরো হাসপাতালের মূল ফটকে তালা দেওয়া হয়, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। তিনি আরও জানান, চলতি বছরের ১৯ অক্টোবর ‘দাগনভূঞা ৫০ শয্যা উপজেলা হাসপাতালে নোংরা পরিবেশ’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। এদিনের আচরণ তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ।
একই অভিযোগ করে দৈনিক বর্তমান বাংলা-র প্রতিনিধি আলা উদ্দিন আল হাসান বলেন, “একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে সমস্যা হলে সৌহার্দ্যপূর্ণ ভাবে কথা বলে সমাধান করা যেত। কিন্তু সাংবাদিকদের হেনস্তা করা হয়েছে, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত। মোবাইল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, যেখানে অসংখ্য রোগী উপস্থিত ছিলেন। এদিকে দুপুর ১টা থেকে হাসপাতালের কর্মরত চিকিৎসকদের নিয়ে একটি এনজিওর উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়। এতে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সহ সব চিকিৎসক অংশ নেন।
অভিযোগ রয়েছে, এ সময় জরুরি বিভাগে চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকায় রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এক বয়স্ক রোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“সকাল ১০টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছি। এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে ঘুরানো হচ্ছে। আমি কার কাছে চিকিৎসা নেব?” অন্য রোগীরাও অভিযোগ করেন, নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া যায় না, প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয় না এবং স্টাফদের আচরণ রোগীদের প্রতি অবমাননাকর। ঘটনা টি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক মহল ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এস এম সোহরাব আল হোসাইন বলেন,
“ফরহাদ আহমেদ যে সাংবাদিক তা আমি জানতাম না। অনুমতি ছাড়া আউটডোরে ভিডিও করা হয়েছে। ছবি বা ভিডিও করতে হলে আমার অনুমতি প্রয়োজন। সাংবাদিক হেনস্তার অভিযোগ আইনগত বিষয়, তাই প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছি।”তবে জরুরি বিভাগে চিকিৎসক অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এ বিষয়ে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. রুবাইয়াত বিন করিম বলেন, সংবাদকর্মী’রা সংবাদ সংগ্রহ করতে পারেন, এতে কোনো বাধা নেই। তবে মোবাইল কেড়ে নেওয়া বা হাসপাতালের গেট তালাবদ্ধ করার বিষয়টি দুঃখজনক। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।