বিশেষ প্রতিনিধিঃ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হতেই পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে জোর গুঞ্জন শুরু হয়েছে। রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) আইজিপি বাহারুল আলম পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন—এমন আলোচনা ছড়িয়ে পড়লেও অন্তর্বর্তী সরকার এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। ফলে বাংলাদেশ পুলিশ নেতৃত্বে সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে জল্পনা-কল্পনা আরও ঘনীভূত হয়েছে।
পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করছেন,দীর্ঘ অবসরপ্রাপ্ত মধ্য হতে কাউকে নয় বরং ক্লিন ইমেজের চলমান কর্মকর্তাদের মধ্য হতে দায়িত্ব দেওয়া হলে বাহিনীর কার্যক্রমে গতিশীলতা বাড়বে। এ প্রেক্ষাপটে বিসিএস ১৫ ব্যাচের ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমান, ডিআইজি ড. নাজুমুল করিম খান ও ডিআইজি ড. আক্কাছ উদ্দিন ভূইয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল হয়। এর ধারাবাহিকতায় একই বছরের ২১ নভেম্বর বাহারুল আলম’কে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি বিদায়ী আইজিপি মো. ময়নুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হন। নিয়ম অনুযায়ী চলতি বছরের ২১ নভেম্বর তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এর আগেই পদত্যাগের গুঞ্জন সামনে এসেছে।
ষড়যন্ত্র ও বঞ্চনার অভিযোগ: অন্তর্বর্তী সরকারের ১৫ মাস পার হলেও বঞ্চিত ও পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রভাবশালী মহলের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ কারীদের দাবি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের নজরের বাইরে কয়েক জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিতদের টার্গেট করছেন। অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘদিন পদবঞ্চনার শিকার কর্মকর্তাদের কার্যকর দায়িত্ব থেকে দূরে রাখাই একটি চক্রের মূল লক্ষ্য। ইতো মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদচ্যুত এক বিশেষ সহকারী ও প্রভাবশালী সচিবের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন একাধিক ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
এর মধ্যে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ সাবেক কমিশনার ড. মো. নাজমুল করিম খান সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। এর আগে গত মার্চে কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমান’কে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। এছাড়া ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) ফারুক আহমেদকে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদে বদলি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এসব কর্মকর্তাই আওয়ামী লীগের আমলে পদোন্নতি বঞ্চিত ছিলেন এবং তাদের পরিবারও বিভিন্ন সময় হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সূত্র মতে, বিসিএস ১৫ ব্যাচের ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমান ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ রেঞ্জে যোগদান করেন এবং ভেঙে পড়া পুলিশের মনোবল পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। একই ভাবে, ডিআইজি ফারুক আহমেদ ছাত্র- জনতার গণ আন্দোলনের পর বাহিনী পুনর্গঠনে সক্রিয় থাকলেও পরবর্তীতে তাকে র্যাবে বদলি করা হয়।
পদায়ন হলেও গুরুত্বহীন দায়িত্ব :
অতীতে দীর্ঘদিন পদবঞ্চনার শিকার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদকে পরবর্তীতে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দিয়ে হাইওয়ে পুলিশে বদলি করা হয়। একইভাবে, ডিআইজি আবু রায়হান মোহাম্মদ সালেহ, ডিআইজি মোহাম্মদ উসমান গনি এবং এ.কে.এম মোশাররফ হোসেন মিয়াজীসহ একাধিক কর্মকর্তা’কে পদায়ন করা হলেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রাখা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার মতে, দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের যথাযথ পদায়ন না করায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
দীর্ঘ শাসনামলে বৈষম্যের অভিযোগ :
আওয়ামী লীগের টানা সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ছাত্রলীগ ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া পুলিশের অনেক কর্মকর্তার ভাগ্যে পদোন্নতি জোটেনি—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, অনেক কর্মকর্তাকে মিথ্যা ও কাল্পনিক অভিযোগে বছরের পর বছর ওএসডি করে রাখা হয়েছে বা চাকরির বাইরে রাখা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বিসিএস ১৫, ১৬, ১৮ ও ২০ ব্যাচের অন্তত ১০১ জন কর্মকর্তার মূল্যায়ন এখনো হয়নি বলে দাবি করা হচ্ছে। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক আনুগত্যে আপস না করায় তারা দীর্ঘদিন পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২ সালে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ২০তম ব্যাচের কয়েক জন কর্মকর্তাকে ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
ব্যক্তিগত বঞ্চনার উদাহরণ :
সাহসী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায় আদেশ না মানায় দুই দফা চাকরি হারান বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। আদালতের নির্দেশ ও নির্বাহী আদেশে চাকরি ফিরে পেলেও পদোন্নতির ক্ষেত্রে বঞ্চনা অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (ক্রাইম) ড. আশরাফুর রহমান, ডিআইজি ড. আক্কাছ উদ্দিন ভূইয়া এবং ডিআইজি নজমুল হোসেন দিদারসহ একাধিক কর্মকর্তা’কে দীর্ঘদিন একই পদে আটকে রাখার অভিযোগ ও উঠে এসেছে। পদোন্নতিজট নিয়ে ক্ষোভ : সূত্র জানায়, অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদে একাধিক শূন্য পদ থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে না। চলতি বছরের ২৯ মে ডিআইজি পদে ২৯ টি শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতির প্রস্তাব পাঠানো হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সরকার পরিবর্তনের পরও পদোন্নতিজট না কাটায় বাহিনীর ভেতরে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। এক কর্মকর্তা বলেন, “সহসাই এ জট না খুললে এর প্রভাব আগামী জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।”
মন্তব্য মেলেনি : অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদে পদোন্নতিজট বিষয়ে জানতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এবং আইজিপির সঙ্গে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। গোয়েন্দা তথ্য মতে জানা গেছে, তিনজন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা নাম পরবর্তী আইজিপির জন্য সক্রিয় বিবেচনার জন্য নতুন সরকারের নিকট উপস্থাপিত হয়েছে।